Advertisement
শবে বরাতে করণীয় ও বর্জনীয়লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান, শবে বরাত, লাইলাতুল বারাআত বা মুক্তি ও সৌভাগ্যেরজনী হিসেবে পরিচিত শাবান মাসের ১৪ তারিখের দিবাগত রাত। এ রাতে আল্লাহ তায়ালা বান্দাকে ক্ষমা করেন। আল্লাহর কাছে কোনো কিছু চাইলে তিনি দান করেন এবং মৃতদেরকে ক্ষমা করেন।
হাদিস শরীফে এই রাত সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে—
উম্মুল মু’মিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা বলেছেন, একদিন গভীর রাত্রে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়ছিলেন। নামাজ পড়ার সময় তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে দীর্ঘ সেজদা করেন। এভাবে দীর্ঘ সেজদা করতে দেখে, হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা উনার ধারণা হয়, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হয়তো নামাজ পড়তে গিয়ে ওফাত মুবারক করেছেন।
হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তখন উনার সন্দেহ দূর করার জন্যে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া বৃদ্ধাঙ্গুলিটি ধরে নাড়া দেন। তাতে রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আঙুল নাড়িয়ে সাড়া দেন। এরপর রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেজদা থেকে উঠে নামাজ শেষ করে হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা কে বললেন, হে আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা। আপনার কি ধারণা, আল্লাহপাক উনার রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আপনার হক নষ্ট করবেন? হজরত আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তখন উত্তরে বলেন, না, ইয়া রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।
আপনার দীর্ঘক্ষণ সেজদা করা দেখে আমি শঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। আমার মনে হয়েছিল, আপনি হয়তো ইন্তেকাল করেছেন! তাই আমি আমার সন্দেহ মেটানোর জন্য আপনার আঙুল নেড়ে, আপনাকে পরীক্ষা করে দেখছিলাম আপনি জীবিত আছেন কি না।
নবীজি তখন আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা -কে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি জানেন, আজকের রাতটি কী রাত? আয়েশা সিদ্দিকা রদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহা তখন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উনাকে বলেন, আল্লাহপাক ও উনার রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার থেকে ভালো জানবেন আজেকের রাতটির তাৎপর্য কী!
তখন রসুলাল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ মুবারক করেন, আজকের রাতটি হলো অর্ধ শাবানের রাত। মহান আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তার বান্দার সব প্রার্থনা মনোযোগ সহকারে শোনেন। যারা ক্ষমাপ্রার্থী তাদের পাপ ক্ষমা করে দেন। আর যারা অনুগ্রহপ্রার্থী তাদের অনুগ্রহ করেন, তাদের বরকত প্রদান করেন। আর যারা বিদ্বেষ পোষণকারী, তাদের ক্ষমা না করে তাদের নিজের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। (শুআবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২-৩৮৬)
ফজিলতের কারণে মুসলিম বিশ্বে রাতটি বিশেষভাবে উপযাপন করা হয়। অনেকেই মসজিদে গিয়ে ইবাদত করেন, তিলাওয়াত করেন। এই রাতের ইবাদত নিয়ে বেশ কিছু ভুল প্রচলন রয়েছে। তাই এই রাতের ইবাদত সম্পর্কিত করণীয় বজর্ণীয় বিষয়ে তুলে ধরা হলো এখানে—
শবে বরাতের করণীয়
>> ইশা ও ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করা উচিত এই রাতে। এই রাতে আমরা অনেকেই নফল ইবাদতে মগ্ন থাকি। রাত জেগে নফল ইবাদতের ফলে ফজর নামাজ পড়া হয় না। অথচ নফল ইবাদতের থেকে ফরজ ইবাদত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি ইশা ও ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করলে তিনি পুরো রাত নফল ইবাদত করার সওয়াব পান।
>> নফল নামাজ পড়া উচিৎ যেহেতু রাতটি বিশেষ ফজিলত পূর্ণ। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এই রাতে নফল নামাজ পড়েছেন। তাই আমরাও রাতটি নফল নামাজের মাধ্যমে কাটাতে পারি।
>> তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া যেতে পারে এই রাতে। নফল ইবাদত হিসেবে তাহাজ্জুদ নামাজ প্রতি রাতেই পড়ার নিয়ম। তবে ইবাদতে অভ্যস্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের জন্য বছরের অন্যান্য রাতগুলো তাহাজ্জুদ পড়া কিছুটা কষ্টকর। তাও তারা এই রাতে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে পারেন।
>> আল্লাহর কাছে দোয়া করতে পারেন এই রাতে। আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করলে তা অবশ্যই কবুলের সম্ভবনা রয়েছে। তাই নিজের ও অন্যের সমস্যা, প্রয়োজন নিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত।
>> তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা। মানুষ হিসেবে আমরা প্রতিনিয়ত গুনাহ করে ফেলি। গুনাহের পর তাৎক্ষণিক তওবা করা নিয়ম। অনেক সময় অবহেলা করে তওবা করা হয় না। এই রাতে তওবা করে গুনাহ থেকে মাফ চাওয়া উচিত। তওবার নামাজ পড়া যেতে পারে অথবা সরাসরি দোয়ার মাধ্যমে তওবা করা যেতে পারে। তবে নামাজের পরে তওবা বেশি কার্যকরী।
>> কোরআন তিলাওয়াত করা যেতে পারে। কোরআন তিলাওয়াত মানুষকে আল্লাহ তায়ালার নিকটবর্তী করে। ফজিলতপূর্ণ এই রাত তিলাওয়াতে কাটানো উত্তম।
>> মুনাজাত ধরে মহান রব তায়ালা উনার কাছে বেশি বেশি প্রয়োজনীয় হালাল বিষয়গুলো চাওয়া ও ক্ষমা চাওয়া উচিৎ।
শবে বরাতে বর্জনীয়
>> শবে বরাত পুণ্যময় রজনী। এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে কাটাতে হবে। হাদিসে বর্ণিত নেই এমন কোনো কাজ করা যাবে না এই রাতে। এবং যেকোনো ধরনের নোংরা ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।
>> শবে বরাতের মত পুণ্যময় রাতে আতশবাজি, পটকা ফোটানো ও যা যা মানুষের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটায় এমন কাজ করা যাবেনা।
>> কেউ চাইলে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে পারে। তবে এই দিনে ভালো খাবার তৈরি করতেই হবে এমনটা মনে করা যাবে না।
>> ইবাদত বাদ দিয়ে অন্যান্য কাজ করা ও অতিরিক্ত খাবার তৈরি করে সময় অপচয় করা অনুচিত।
>> এ রাতে বাড়িঘর, মসজিদ ও ধর্মীয় স্থাপনা প্রয়োজনের অতিরিক্ত আলোকসজ্জা থেকে বিরত থাকা উচিত। আল্লাহ পাক বলেন, ‘তোমরা অপচয় করোনা, নিশ্চয়ই অপচয়কারী শয়তানের ভাই।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ২৭)
>> পুরো ইবাদত বন্দেগী বাদ দিয়ে ছবি তোলা থেকে বিরত থাক উচিৎ। পবিত্র হাদিসে বর্ণিত আছে, ’’কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন শাস্তি হবে তাদের, যারা প্রাণীর ছবি তোলে বা তৈরি করে।” [সহীহ বুখারী, নবম খণ্ড, হাদিস নং ৫৫২৬ – ইসলামিক ফাউন্ডেশন]।
>> লোক দেখানো ইবাদত বন্দেগি থেকে বিরত থাকা উচিৎ।
>> এ রাতে নামায কালাম পড়া ইবাদত বন্দেগি করা থেকে মানুষকে যারা বিরত থাকতে বলা অনূচিত।
>> পুরো রাত নফল ইবাদতে কাটিয়ে ফজর নামাজের মতো ফরজ ইবাদত কাজা করা যাবে না।
Advertisement
Event venue
বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টার, Dhaka, Bangladesh
Tickets